লাইকেন :বৈশিষ্ট্য এবং শ্রেণিবিভাগ Lichen its Character & Classification.
লাইকেন কী?
শৈবাল ও ছত্রাক মিলিতভাবে সম্পূর্ন পৃথক ধরনের এক জাতীয় উদ্ভিদ সৃষ্টি করে
যাকে বলা হয় লাইকেন।
ছত্রাক ও শৈবালের ঘনিষ্ট এসোসিয়েশনের ফলে সৃষ্ট বিশেষ প্রকৃতির থ্যালয়েড গঠনকে লাইকেন বলা হয়।
ছত্রাকও শৈবালের ঘনিষ্ট সহাবস্থানকে মিথোজীবিতা( Symbiosis)বলে।
যখন দুটি ভিন্ন প্রজাতীর জীবের মধ্যে এমন সম্পর্ক স্থাপিত হয় যে তাদের ঘনিষ্ট
সহাবস্থানের ফলে এক অন্যের নিকট তে উপকৃত হয় তখন তাদের এ ধরনের
সম্পর্ক কে মিথোজীবিতা বলে। আর দুটি জীবকে মিথোজীবি জীব বলে।
লাইকেনের বাসস্থান:
লাইকেন গাছের বাকল, সজীব পাতা, বন্ধ্যা মাটি, পাকা দেয়াল, ক্ষয় প্রাপ্ত কাঠের
গুঁড়ি ইত্যাদি বস্তুর উপর জন্মে।
লাইকেন তুন্দ্রা অঞ্চল, মরু অঞ্চল, নীরস পর্বত গাত্রসহ সমস্ত প্রতিকূল অবস্থানে
এরা জন্মাতে পারে। তাই লাইকেনকে বিশ্বজনীন ( Cosmopolitan) বলে।
লাইকেনের বৈশিষ্ট্য:
১. লাইকেন একটি দ্বৈত সংগঠন।কারন এতে শৈবাল ও ছত্রাক থাকে।
২. ছত্রাক লাইকেনের থ্যালাস কাঠামো গঠন করে। কাঠামোর ভেতরে শৈবাল
জন্মায়।
৩. লাইকেন চ্যাপ্টা, বিষমপৃষ্ঠ অথবা শাখা প্রশাখা যুক্ত।
৪. লাইকেন সাদা বর্ণের হয়ে থাকে। তবে কালো ,কমলা ,হলুদ বর্নেরও হয়ে থাকে।
৫. এরা স্বভোজী অর্থাত নিজেদের খাবার নিজেরা তৈরি করতে পারে।
৬. এরা বায়ু দূষণের প্রতি সংবেদনশীল।
৭. লাইকেনের শৈবালকে ফটোবায়োন্ট বলে। এরা নীলাভ-সবুজ শৈবাল বা সবুজ
শৈবালের অর্ন্তভুক্ত।অপরটির ছত্রাক যাকে মাইকোবায়োন্ট বলে। ছত্রাক গুলো
অ্যাসকোমাইসটিস শ্রেণির ও কিছু ব্যাসিডিওমাইসেটিস শ্রেণির অর্ন্তভুক্ত।
লাইকেনে শৈবাল যে ভাবে উপকৃত হয়ঃ
১. শৈবাল ছত্রাকের দেহে আশ্রয় গ্রহণ করে।
২. ছত্রাক পরিবেশ থেকে পানি, খনিজ লবণ, জলীয় বাষ্প ইত্যাদি শোষন করে শৈবালকে প্রদান করে।
৩. ছত্রাকের শারীরবৃত্তীয় কাজের ফলে সৃষ্ট কার্বন-ডাই অক্সাইড ও পানি শৈবাল
সালোক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় কাজে লাগায়।
লাইকেনে ছত্রাক যে ভাবে উপকৃত হয়ঃ
১. ছত্রাক শৈবালের দেহ থেকে হস্টোরিয়ামের সাহায্যে খাদ্য গ্রহণ করে বেঁচে থাকে।
২. ছত্রাকের শারীরবৃত্তীয় কাজের ফলে সৃষ্ট বর্জ্য ও জলীয় বাষ্প দেহ থেকে
অপসারনের জন্য ছত্রাককে কোন প্রকার শক্তির অপচয় করতে হয় না।
লাইকেনের শ্রেণিবিভাগ:
বাসস্থানের ভিত্তিতে লািইকেনের শ্রেণিবিভাগঃ
১. কর্টিকোলাসঃ এরা গাছের বাকল বা কান্ডের উপর জন্মে। যেমন: Graphis, Parmelia
২.টেরিকোলাসঃ উষ্ণ ও আর্দ্র অঞ্চলের মাটিতে জন্মে। যেমন: Collema tenax,
৩. স্যাক্সিকোলাস: শীতপ্রধান অঞ্চলের পাথরের গাত্রে জন্মে। যেমন: Coloplecta
৪. লিগনিকোলাস: এরা সরাসরি ভেজা কাঠের উপর জন্মায়। যেমন: Calicicum
গঠনগত শ্রেণিবিভাগঃ
বিজ্ঞানী হক্সওয়ার্থ ও হিল ১৯৮৪ সালে লাইকেনকে পাঁচ ভাগে ভাগ করেন-
১. লেপ্রোজ লাইকেন:
সবচেয়ে সরলতম লাইকেন।
২. ক্রাসটোজ লাইকেনঃ
এরুপ লাইকেন চ্যাপ্টা, ক্ষুদ্রাকার এবং পোষকের সাথে লেগে থাকে। যেমন: Graphis scripta, Strigula
![]() |
| Crustose Lichen |
![]() |
| Crustose Lichen |
৩. ফোলিয়োজ লাইকেনঃ
এসব লাইকেন দেখতে অনেকটা পাতার মতো। এদের কিনারা খাঁজ কাটা।যেমন: Parmelia
![]() |
| Foliose Lichen |
![]() |
| Foliose Lichen |
৪. ফ্রুটিকোজ লাইকেন:
এ ধরনের লাইকেন চ্যাপ্টা বা দন্পডর মতো, অধিক শাখা প্রশাখা যুক্ত।এধরনের লাইকেন অনেক সময়ই ঝুলে থাকে।
যেমন: Cladonia leporina, Usnea
![]() |
| Fruticose Lichen |
![]() |
| Fruticose Lichen |
5. সূত্রাকার লাইকেন:
এ লাইকেনের শেবাল অংশটি সূত্রাকার। এরা সামান্য কয়েকটি হাইফি দ্বারা আবৃত থাকে। যেমন: Racodium, Epheba
লাইকেনের অন্তর্গঠন:
লাইকেনের গঠন নিম্নরুপ-
লাইকেন েপ্রস্তচ্ছেদ করলে কয়েকটি স্তর দেখা যায় যেমন:
১. ঊর্ধ্ব কর্টেক্স:
এ স্তরটি ছত্রাকীয় হাইফি দ্বারা গটিত। এ স্তরে কোন ফাঁকা স্থান থাকে না।
![]() |
| Foliose Lichen |
২. শৈবাল স্তর:
এ স্তরে ছত্রাকের ফাঁকে ফাঁকে শৈবাল অবস্থিত।এ স্তরে ছত্রাক শৈবালের দেহে হস্টোরিয়া প্রবেশ করে দেয়।
৩. মেডুলা:
এ স্তরটি ফাঁকা ফাঁকা ভাবে অবস্থিত ছত্রাকীয় হাইফি দ্বারা গঠিত। এ স্তরটি অপেক্ষাকৃত পুরু।শৈবাল স্তরের নিচে এটি অবস্থিত।
৪. নিম্ন কর্টেক্স:
মেডুলার নিচে এ স্তরটি। হাইাফ ঘন সন্নিবেশিত হয়ে এ স্তরটি গঠিত হয়। এ স্তরের
নিচের পৃষ্টে বহু এক কোষী রাইজয়েন ( রাইজয়েড তুল্য) থাকে যা লাইকেনকে
নির্ভরশীল বস্তুর সাথে আটকিয়ে রাখতে সাহায্য করে।
১. মরুজ ক্রমাগমন: লাইকেন মাটি গঠনে সাহায়্য করে । লাইকেনের
মৃতদেহাবশেষ থেকে হিউমাস গঠিত হয়। এ সব হিউমাস পাথরের সাথে মিশে মাটি গঠন করে।
২. মানুষের খাদ্য হিসাবে লাইকেন: অধিকাংশ লাইকেনে লাইকেনিন নামক
কার্বোহাইড্রেট থাকার কারনে কিছু প্রজাতি খাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়।যেমন: Cetraria slandica, Parmelia
3. পশুর খাদ্য হিসাবে: Cladonia rangiferina নামক লাইকেন
Raindeer মস নামে পরিচিত যা বলগা হরিন ও গবাদি পশুর খাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়।
৪. অ্যান্টিবায়োটিক হিসাবে:কিছু লােইকেনঅ্যান্টিবায়োটিক তৈরিতে ব্যবহার করা
হয়। এসব অ্যান্টিবায়োটিক গ্রাম পজেটিভ ব্যাকটেরিয়ার উপর কাজ করে।
৫. উদ্ভিদ রোগ নিরাময়ে:
লাইকেন উদ্ভিদ রোগ নিরাময়ে ব্যবহৃত হয়। লাইকেন থেকে প্রাপ্ত সোডিয়াম
উসনেট টমেটোর ক্যাঙ্কার রোগ নিরাময়ে ব্যবহৃত হয়।
৬. লিটমাস পেপার তৈরিতে:
৭. সুগন্ধি ও প্রসাধনী সামগ্রী প্রস্তুতিতে:
৮. রং ও ট্যানিন উৎপাদনে
৯. উত্তেজক পদার্থ তৈরিতে।
লাইকেনের ক্ষতিকর দিক:
লাইকেন বৃক্ষ, পুরাতন ইটের দেয়াল, মার্বেল পাথরের তৈরি সৌধ ইত্যাদির ক্ষতি
সাধন করে থাকে। কিছু লাইকেন আছে বিষাক্ত । এসব লাইকেন খাদ্য হিসাবে গ্রহন
করলে গবাদি পশু এমন কি মানুষ ও মারা যেতে পরে।
কিছু প্রজাতীর লাইকেন উদ্ভিদের বাকল, পাতা নষ্ট করে।
যেমন: Cladonia, Usnea আশ্রয় দাতা উদ্ভিদের বাকলসহ অন্যান্য অংশের ক্ষতি সাধন করে।
Evernia, Usnea মানুষের চর্মরোগ, এলার্জি ও হাঁপানি রোগ সৃষ্টি করে।
পরিবেশ দূষণের নির্দেশক : হিসাবেও লাইকেন ভূমিকা রাখে।
লাইকেন বাতাস বা বৃষ্টির পানি থেকে অতি দ্রুত তার প্রয়োজনীয় বস্তু শোষন
করতে পারে। একইভাবে সালফার ডাই অক্সাইড, হেভি মেটাল রেডিও একটিভ
বস্তু ও দ্রুত শোষণ করে থাকে। এসব দূষিত বস্তু শোষণের ফলে এদের মৃত্যু ঘটে।
এভাবে লাইকেন বায়ু দূষণের নির্দেশক হিসাবে কাজ করে।
লাইকেনের পরিবেশীয় গুরুত্ব:
১. পাথর থেকে মাটি তৈরি:
২. নাইট্রোজেন সংবন্ধনে লাইকেন ভূমিকা রাখে।
৩. মাটির পানি ধারন ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
৪. পরিবেশ দূষণের ইন্ডিকেটর হিসাবে কাজ করে।
.jpg)
.jpg)
.jpg)
.jpg)



No comments